যশোধরা রায়চৌধুরী

দেবারতির কবিতাবিশ্ব

বাঁশের সাঁকোটি জলে ভেসে গেছে,
ঘাটে এসে উবজো ভূত দাঁড়িয়ে রয়েছি একা একা-
ঝুপসি অলক্ষ্মী পানা, শিকড়বিহীন সাদা স্রোত,
শামুকখোলের মতো ভারী মেঘ;
‘আমি তবে যাই’
হঠাৎ জলের ঘুর বলে উঠল মালতীর ভাই।

যা থেকে আমার নিজের কোনো অর্জন নেই তা আমি পড়ব কেন? কেন ফিরে যাই দেবারতি মিত্র-র মত কবির কাছে বার বার? কেননা তিনি তাঁর কবিতায় ও ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথায় যা দেন তা প্রচুর। অমোঘ। অজস্র।

এই পোড়া দেশে একজন প্রকৃত ও মহৎ কবিকে চিনে নিতে অক্ষম পাঠককুলের কাছে তুলে ধরতে হয় কবির জীবনযাপন। প্রকৃত সাধক সাধিকার জীবন কাটিয়েছিলেন মণীন্দ্র-দেবারতি এ কথা অস্বীকার না করেই, বলা যায়, দেবারতির অক্ষরসমূহ কেন যথেষ্ট হবে না আমাদের জন্য, এ কথা বোঝাবার জন্য, যে তিনি ছিলেন কবিতানিবেদিত সত্তার মানুষ। প্রখ্যাত দম্পতি বাংলা কবিতায় কম নেই, মণীন্দ্র-দেবারতি সেই ধারায় আমাদের নমস্য এবং দুইজনের বিচ্ছুরণ অনেক দূর অব্দি আমাদের অধিকার করে রাখে। এইসব মেনে নিয়েও আজও বেদনা পাই যখন দেখি কবির অক্ষরসমূহকে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ হয় না , উল্টে তাঁদের নিয়ে স্টোরিটেলিং চলে, অ্যানেকডোট উপাখ্যানের বন্যা বয়। নিজের জীবনের আয়নায় দেখা হয় কবিদের। “আমাকে উনি খুব স্নেহ করতেন” দিয়ে শুরু ও শেষ হয় মৃত্যুপরবর্তী শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

কবি দেবারতি মিত্র-র দীর্ঘ লেখালেখির ইতিবৃত্ত আছে। শুধু তাই না, তিনি নিভৃতচারী ও তথাকথিত অ-বাক্‌পটু হয়েও অনেকটাই বলে গিয়েছেন তাঁর লেখালেখি সম্বন্ধে।

যেমন ২০১৬ সালে দেবারতি এই অধমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেনঃ

কবিতা নিয়ে আলোচনা করার চেয়ে কবিতা নিয়ে একা একা ভাবতেই আমি বেশি ভালবাসি। কবিতা নিয়ে বলতে গিয়ে দেখেছি, তাকে না পারছি ঠিকমতো বুঝতে, না পারছি বোঝাতে – কবিতার ভাব ও মর্ম কেমন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

তার কিছু পরে নিজের কবিতা লেখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেছিলেনঃ

আমাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়মিত সংসারের কাজকর্ম করতে হয়, ব্যাঙ্ক পোস্টাফিসে যেতে হয়, সামাজিক দায়িত্বও পালন করতে হয়, সেগুলো আমার খারাপও লাগে না। কিন্তু কী করে জানি না তারই মধ্যে চলে একটা স্পন্দন – কবিতার আবছা বিচ্ছুরণ, আড়মোড়া ভাঙা, নানারকম ছেঁড়াখোঁড়া হাসি ও বেদনা। আবার অনেক সময় বাজার করতে গিয়ে, ডাক্তার দেখাতে গিয়েও পেয়ে যাই কবিতার বীজ। কখনো কখনো তা থেকে গাছ জন্মায়, আর কখনো তা বৃষ্টিজলে, অশ্রুতে ধুয়ে যায়, কোনো চিহ্নই থাকে না। তবু বেশ লাগে।
অনেকদিন কবিতা লিখতে না পারলে একটু হতাশ হয়ে পড়ি তো বটেই।

এই একই সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে বিস্মিত ও অভিভূত করেছিলেন, কবিতা সম্পর্কে সরলতম ও গভীরতম সংজ্ঞা দিয়েঃ

কবিতা এবং সবরকম শিল্পই সম্ভব অসম্ভব, বাস্তব অবাস্তব, উচিত অনুচিতের বাইরে – হয়ে ওঠাই তার একমাত্র শর্ত। কবিতা যদি উতরে যায় তবেই তা সত্যে পৌঁছতে পারে। আমি সত্য বা মিথ্যে কোনোটাই লেখবার চেষ্টা করিনা। শুধু এক অনর্গল চিরনতুন চিরপ্রাচীন প্রবাহকে কবিতায় ধরতে চাই।

 

লিটম্যাগ, কবিতা সংজ্ঞায়ন ও দেবারতি মিত্র

মণীন্দ্র-দেবারতির মূল ভরকেন্দ্র লিটল ম্যাগাজিন।

চিত্রক পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায়, ২০১৫ তে, পাচ্ছি, মণীন্দ্র-দেবারতি-অলোকরঞ্জনের আড্ডা।

অলোকরঞ্জন তাতে বলেছিলেন,

“কালকে তো লিটল ম্যাগাজিন মেলায় গিয়েছিলেন, আর আপনি ‘মিট দ্য অথর এও বলেছেন, ‘আমি লিটল ম্যাগাজিনেরই লোক’। অবশ্য আমিও তাই, দেবারতিও তাই, আর পার্থ তো অবশ্যই, আলোক সরকারও তা-ই বলা যায়, তা লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যে আমাদের একাত্মীকরণ এতদিনের, লিটল্ ম্যাগাজিনের যে অবস্থান তাতে আমাদের ভূমিকাটা কী? তাতে কি প্রমাণিত হয়েছে যে আমরা ঠিকই করেছি এতদিন পর্যন্ত, আমরা যে লিখছি লিটল্ ম্যগাজিনেই, আর এইভাবে লিখতে লিখতেই আমরা যাব, এটাই তো আমাদের স্ট্যানড বলা যেতে পারে…”

উত্তরে মণীন্দ্র বলেন:

আমার নিজের ব্যক্তিগত কোনো, মানে সেরকম কোনো ইচ্ছেই কাজ করেনি। আমার একটা সোজাসুজি কথা ছিল, আমি লিখতে গেলে আমার একটা কাগজ চাই এবং কার কাছে আমি যাব? তার জন্যেই কাগজ। এই করতে করতে বুঝলাম, আমি একা তো যথেষ্ট নই, একেবারেই কম বরং তখন আপনার মনে আছে বোঝহয়, আমি আপনার কাছে গেছিলাম অশোকতরুর সঙ্গে, সেটা আমার একেবারে প্রথম দিককার চেষ্টা। এখানে আমি কিন্তু ‘মেন’ লোক নই, আপনাদেরই আমি খুঁজে বার করেছিলাম আসল লোক হিসেবে, এবং আপনারা খুব, বিশেষ করে আপনি তো বেশ স্বচ্ছন্দেই, মানে হাসিমুখেই দিয়েছিলেন। আমার এটাও মনে আছে, আমার বিকেলে যাবার কথা ছিল, পরদিন সকালে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম, তাতে আপনি বলেছিলেন যে ‘আমি কিন্তু প্লেজান্ট সারপ্রাইজ দেব ভেবেছিলাম, মানে বিকেলেই দিয়ে দেব’। যাই হোক এইভাবে আমার আরম্ভ হয়েছিল। আরম্ভ হবার পরে না, যেমন আস্তে আস্তে লোকে ঢুকতে থাকে, আমিও তেমনি লিটল্ ম্যাগাজিনের মধ্যে ডুবে গেলাম, এবং প্রেস, আপনারা প্রেসট্রেস- এ অত যেতেন না। আমি কিন্তু প্রেস, কম্পোজিটর, লেখক-মানে সবই করেছি, শুধু ডিস্ট্রিবিউশনটা করতে পরিনি। সেটাতে খানিকটা ব্যবসার ব্যাপার আছে তো, সেটা হয়নি আমার। তা লিটল ম্যাগাজিন আমার সব ইচ্ছে পূরণ করেছে।

এই কথার পিঠে দেবারতি কী বলেন সেদিন?

আমার? না, আমি তো পত্রিকা নিয়ে তখন ভাবতাম না, তখন আমি শুধু কী করে লেখাটা ভালো হবে, কী করে ঠিক হবে, জীবনটাকে কী করে আমি ওর মধ্যে দিয়ে দেখব এই ভাবনাটাই আমার কাছে বড়ো। কিন্তু তারপর এখন, বয়েসে, যখন আমি দেখছি, অনেক লিটল ম্যাগাজিন আমার কাছে আসছে, কারণ একটা কথা হয়তো সবাই প্রমাণ পেয়েছে যে আমি কবিতা পড়ি, উনিও পড়েন, সেজন্য সবাই হয়তো পাঠায়। পাঠিয়ে মতামত চায় যে কিরকম লাগল আপনার, এটা গত দশ-বারো বছর ধরে। এখন হয়েছে কি, এভাবে লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা বেড়ে গেছে, মানে এই শেষ ন-দশ বছর ধরে। তাই জন্য আমি বুঝতে পারছি কমারশিয়াল ম্যাগাজিনে যেসব লেখা সম্ভব নয়, সেটা লিটল্ ম্যাগাজিনে সম্ভব। আমি সব সময় ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছি ওরা অনেক একসপেরিমেন্ট করছে। এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেটা আমি কমারশিয়াল পত্রিকায় দেখিনি। কমারশিয়াল পত্রিকায় যখন তারা লেখে তখন কনভেনশনাল লেখা দেয়, সেগুলি যে খুব অনাধুনিক তা নয়, কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন সংস্কারটংস্কার কম মানে, মানে এখানে অনেকটা যা ইচ্ছে তাই লেখা যায়। যৌনতা সম্বন্ধে সংস্কারটংস্কার কম মানে। তার ওপর প্রযুক্তির কথা আছে। তারপর তো খিস্তিখেউর অনেকই আছে। এসব তো নামকরা পত্রিকা ছাপবে না। সেটা তারা জানে…

এ বিন্দু থেকেই বোঝা যায় মণীন্দ্র-দেবারতির নির্লিপ্তি এক, তাও দেবারতি আরো অন্তর্মুখী, আরো বেশি বিশুদ্ধ কবিতা নিয়ে চিন্তিত।

এর পর পর দেবারতি দেশ পত্রিকা প্রসঙ্গে বলছেন:

আর একটা কথা, ভাষা নিয়ে একপেরিমেন্টও লিটল্ ম্যাগাজিনে যতটা হয় সেটা ওখানে হয় না। তার মানে কী, ব্যাকরণের নিয়ম মানছে না, ভালো সেটা, অসমাপ্ত বাক্য লিখছে, এসমস্ত জিনিসগুলো দেশ ছাপবে বলে আমার মনে হয় না। মোটামুটি একটা কাঠামোর মধ্যে তোমাকে থাকতে হবে। সেটা লিটল ম্যাগাজিনে নেই। আমি কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের এইগুলোরই সমর্থক। আমাদের জানা দরকার কীরকমভাবে পালটাচ্ছে কবিতাটা। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, “মা বেদবেদান্তও তুই, খিস্তিখেউরও তুই।” আমি বিশ্বাস করি মন্দির দেবালয় ঈশ্বরের মূর্তি থেকে শুরু করে আঁস্তাকুড়, যতরকমের জঘন্য ন্যক্কারজনক চোরজোচ্চোরদের আড্ডা সবজায়গাতেই কিন্তু কবিতা থাকে। কবিতার শুদ্ধ-অশুদ্ধ বলে কিছু নেই। শুদ্ধ কবিতাতে আমি বিশ্বাস করি না। বাপী বলেছে, উনি শুদ্ধ কবিতা লেখেন। কিন্তু আমি সেকথা বিশ্বাস করি না। কবিতা-অত সীমাবদ্ধ সে নয়। তাকে ছেড়ে দিতে হবে। যেখানে ইচ্ছে সে যেতে পারে। উড়তে পারে, জলে সাঁতরাতে পারে, মহাকাশ পেরিয়ে যেতে পারে, তবে সে কবিতা। কতকগুলো নিয়মে বেঁধে দিলাম আমি, পয়ার আর ওই সাত-সাত মাত্রা, কতকগুলো বিষয়বস্তু নির্বাচন করলাম-সেটা কিন্তু ভীষণ খারাপ। বরঞ্চ ওই ছেলেরা, মেয়েরা অনেকসময় বিফল হচ্ছে। সবসময় তারা যে সার্থক হচ্ছে তা নয়, কিন্তু তবু আমার দিক থেকে কনভেনশনের বাইরের ওই কবিতা আমি পড়ি। পড়ে আমি নিজে শেখবার চেষ্টা করি, উজ্জীবিত হবার চেষ্টা করি। কনভেনশনাল কবিতা থেকে আমাদের শেখার তেমন কিছু নেই। তা বলে কি পড়ি না? রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ পড়িনি? সেটা আনন্দের জন্যে, কিছু শেখবার জন্য নয়। মানে শিখতে গেলে আমি মহাবিপদে পড়ে যাব, ওই ট্র্যাপে পড়ে যাব। আমার আর মুক্তি নেই। অত বড়ো ট্র্যাপ থেকে বেরোনোর মতো শক্তি আমার নেই।

এই চিত্রক পত্রিকার আলোচনাটি অত্যন্ত ঋদ্ধ, দামি, এখানে কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করার কথা হচ্ছিল, কথা হচ্ছিল, বিশ্ব সাহিত্যের নিরিখে, কাব্যানুশাসন বলে কিছু হয় কিনা তাই নিয়ে। সেখানে এক জায়গায় অলোকরঞ্জন মণীন্দ্র দেবারতি সহমত হলেন যে কবিতার কোন সংজ্ঞা নেই, এবং পত্রিকা সম্পাদকের কাব্যানুশাসনের অধিকারও নেই। কোনটা কবিতা হয়েছে, কোনটা নয়, বলার বা বোঝার কোন ক্ষমতাই কি কারুর আছে?

এই আড্ডাতেই দেবারতি বলেছিলেন সেই অমোঘ কথাটি:

কবিতা কখনো জেনে লেখা যায় না।

সময় যে কবিতা রচনা করে তাকে কাটাকুটি করে কবি নিজেই পরিমার্জনার অধিকারী নন, এমন কথাও বলেন দেবারতিরা। “ফিরিয়ে আনা যায়না। সতেরো বছর পরে একটা কবিতার পরিমার্জনা কী করে হয়?”

 

নিটোল কবিতাবিশ্ব ও দেবারতি

স্বল্প আলাপে, স্বল্প বাক বিস্তারেও এভাবে বারে বারে দেবারতি ফিরে এসেছেন কবিতা নিয়ে কথায়।

কলঘরের ভিজে মেঝে – বসে বসে চুল ছড়িয়ে কাঁদি –
তাও যদি ছিঁড়ে যায় আমার একটি মাত্র রক্তের বন্ধন!
মা, তুমি দাঁড়িপাল্লার যেদিকে রয়েছ, তার অন্য দিকে ব্রহ্মান্ড
সম্পূর্ণ ওজনশূন্য, ফাঁকা।
সমুদ্র-ঝিনুকে জন্ম, পড়ে আছি শুয়োরের পায়ের কাদায়।
মা-গান শুনতে শুনতে তারাদের মধ্যিখানে তারা হয়ে কাঁপি।
মা থাকো মা থাকো মা থাকো
পরলোক কোন্‌ দিকে – সে জগতে
হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে একা অন্ধকারে হেঁটে
তোমাকে যদি না খুঁজে পাই!”
(মা থাকো /দেবারতি মিত্র)

 

দেবারতি মিত্র-র কবিতা পড়তে পড়তে যে জার্নি বা ভ্রমণটা আমার হয়ে থাকে, তা একেবারেই অনন্য এক স্বাদের ভ্রমণ। দূর থেকে দূরতর স্থানে তিনি নিয়ে যান আমাদের। একইসঙ্গে তিনি যুক্ত করেন ও যুক্ত থাকেন বিবিধ কবিতার ভাষাসাজের ঐতিহ্যের সঙ্গে। একটি সার্থক কবিতাপাঠ আসলে পাঠকেরও দায়িত্ব বাড়ায়, তাকে মুহুর্মুহু জুড়ে দিতে থাকা নানা ক্রস রেফারেন্সিং বা উল্লেখের জালে। এই নানা পড়ার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার খেলাটা যে কোনো ভাল কবিতাই আমাদের দেয়, এক্ষেত্রেও তিনি দেন।
যেমন, যখন লিখছেন,

তুমি কিছু না ভেবে সব আরম্ভ করে দাও,
তুমি কিছু না ভেবেই সব শেষ করো।
হারমোনিয়াম তা পারে না, কেননা,
গহন বনের কাঠ থেকে তাকে আস্তে আস্তে তৈরি হতে হয়েছিল…

আমার অবধারিতভাবে মনে পড়ে যায়, লিখেছিলেন ফরাসি কবিতার ঈশ্বর র‍্যাঁবো, তাঁর শিক্ষক ইজামবারকেও, একটি বিখ্যাত চিঠিতে, ‘আমি হলাম অন্য কেউ। কী দুরবস্থা সেই কাঠের টুকরোর, যে হঠাৎ দেখে, সে হয়ে উঠেছে বেহালা।’

যশোধরা রায়চৌধুরী : আপনি আমাদের যুক্ত করেন ও নিজে যুক্ত থাকেন বিবিধ কবিতার ভাষাসাজের ঐতিহ্যের সঙ্গে। একটি সার্থক কবিতাপাঠ আসলে পাঠকেরও দায়িত্ব বাড়ায়, তাকে মুহুর্মুহু জুড়ে দিতে থাকা নানা ক্রস রেফারেন্সিং বা উল্লেখের জালে। এই নানা পড়ার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার খেলাটা যে কোন ভাল কবিতাই আমাদের দেয়, এক্ষেত্রেও আপনি দেন। এটার রহস্যটা বলুন।

দেবারতি মিত্র : ছেলেবেলা থেকে সব কিছু জানবার স্পৃহা আমার অত্যধিক, যদিও প্রাথমিক জ্ঞানের ভিত্তি, বিদ্যেবুদ্ধি, যোগ্যতা অতি নগণ্য। আমি যা দেখি, যা পড়ি, প্রায়শই তাতে সম্মোহিত হয়ে যাই। কিন্তু বিষয়টাকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে কখনই পারি না, ফলে তার ভাবটা হয়ত খাপছাড়াভাবে আমার মধ্যে ও আমার কবিতার ওপরে কাজ করে যায়। আসলে আমি একজন ড ড নং।

যশোধরা রায়চৌধুরী : এভাবে বলবেন না দিদি। আমরা সকলেই উঞ্ছবৃত্তি করি, কতটুকু আর বুঝেছি! আচ্ছা, আপনার কবিতার দু-দুটো দিক আছে। একটা দিক, শান্তি, ধ্যান, প্রকৃত প্রাজ্ঞতারই। আমার সদ্য জেগে ওঠা পাঠকচিত্তে দাগ রেখে যাওয়া “অন্ধস্কুলে ঘন্টা বাজে”র সেই কবির হাত থেকে আমি পেয়েছি যে দীর্ঘ ঐতিহ্য, সমাহিত কবিতাধ্যানের, তা ধারণের, পালনের। কবিতায় আপনার কথন ভঙ্গিটি প্রচ্ছন্ন ও নিস্পৃহ।” ( সাক্ষাৎকারের অংশ, ২০১৬)

এক বিশ্ব কবিতা তাঁর থেকে যায়। নির্লিঙ্গ, মহৎ, আকাশসম। চিরদিনকার কবিতাতেই ক্ষুধা আর মানুষের কথা বলে চলেন কবি। কখনো ভঙ্গিটি অবচেতনের ভেতরে ঢেউ তোলা। “হা অন্ন, জো অন্ন” কবিতাটিতে, দেবারতি মিত্র ভিখিরিদের ভিক্ষার কথা বলেন এভাবেইঃ
পাহাড়ের নীচে ভিখিরিরা সারাদিন ভিক্ষে করে/ রান্নার কাঠকুটো কুড়িয়ে ফিরে এল। / তাদের মন কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলল না। / তাদের বুক ফাঁকা, পেটে আগুন,/ প্রাণ কেঁদে উঠল – ভাত, ভাত। (হা অন্ন, জো অন্ন, দেবারতি মিত্র, মুজবৎ পাহাড়ে হাওয়া দিয়েছে)
এইসব কবিতার ভেতর দিয়ে আমরা প্রত্যক্ষ করি অনেকটা ছড়ানো ইতিহাস , রাজনীতিচেতনার কবি দেবারতি মিত্রকে। চিনে নিতে অসুবিধে হয়না, “মিতালি সংঘের মাঠে আবছা অন্ধকারে/কি বা কেন সত্যি সত্যি কোনোদিন জানতে চেয়েছি?” এই আত্মবীক্ষণের কবিকেও। পাই দৃঢ় শ্লেষলব্ধ এইসব লাইন, যা তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনের প্রতিটি স্বাক্ষর বহন করেঃ “যেখানে যত শিল্পী গায়ক কবি লেখক চারুকলা ও উন্মেষ সেখানেই নেতি।/ সব প্রসন্নতাকে আত্মসাৎ করে নিজে টইটুম্বুর হয়ে/ তাঁরা ভাঙাচোরা এবড়োখেবড়ো প্রায় মিথ্যে এক পৃথিবীর জন্ম দেন। “

তাহলে কোন জায়গা থেকে দেবারতি মিত্রকে ধরা যাবে? স্বয়ং সম্পূর্ণ এক পৃথক বিচ্ছিন্ন এবং নির্জন দ্বীপের বাসিন্দা হিসেবে, না সমাজ মনস্ক এক কবি হিসেবে?

দেবারতি নিজেই এর উত্তর দিয়েছিলেন এইভাবেঃ লেখালেখির প্রথম দিকে নিজের সুখদুঃখ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তাম, নিজের অন্তরাত্মার মধ্যে ডুবে থাকতাম। তার নির্যাস উঠে আসত আমার কবিতায়। তারপর যত বয়স বাড়তে লাগল, চারপাশের আনন্দ , উচ্ছ্বাস, বিশেষ করে সমস্যা আমার মনকে প্রচন্ড নাড়া দিতে লাগল। গাছপালা, জীবজন্তু, এত সব মানুষ, এই পৃথিবী দেখলাম কতখানি বিপন্ন। এর প্রতিকার তো আমার হাতে নেই, কিন্তু গোচরে, অগোচরে তারা চলে আসতে লাগল আমার কবিতায়। একে কি একজন উপায়হীন মানুষীর শৌখিন বিলাপ তুমি বলবে?
কারো পক্ষেই দেশকাল, প্রতিবেশ, পরিবেশ, বাদ দিয়ে জীবন কাটানো সম্ভব নয়। নিজের চোখকান, সংবাদ মাধ্যম, লোকের মুখে শোনা ঘটনার বিবরণ তোমার ওপর এসে আছড়ে পড়বেই। কোনো নির্জন দ্বীপে বসে কবিতার সাধনাটা সোনার পাথরবাটির মত অ্যাবসার্ড ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়।

 


নারীবিশ্ব ও দেবারতি

মেয়েরা যে মুহূর্তে কলম হাতে নেন সেই মুহূর্তে এই সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে হয় তাঁদের। এটা একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন। সমস্ত লেখালেখির পরম্পরায় আমরা যে যৌনতাকে দেখি তা আমাদের প্রার্থিত কিনা, প্রেয় কিনা। হয়ত আবার ফিরে যাব ইংরেজ নারীবাদী জার্মেন গ্রিয়ারের একটি বক্তব্যেই, যেখানে তিনি ওই পরম্পরাগত যৌনতায় মেয়েদের অবস্থান নিয়েই বলেন, “this is not what our sexuality is . Our sexuality is like everybody else’s. It’s questing, it’s investigative, it’s desirous, it’s looking for novelty, excitement and passion, and intensity, and all that stuff. “ ( Hard talk )
এই চাহনিটিকেই আমি বলতে চাইছি নারীর চাহনি, আর এখানেই আমরা খুঁজে পাচ্ছি গ্রিয়ার কথিত “কোয়েস্ট” বা খোঁজ, পাচ্ছি “ডিজায়ার” বা কামনা, পাচ্ছি নতুনত্ব, উত্তেজনা ও প্যাশনের খোঁজ।

পঞ্চাশ -ষাটের দশকে কৃত্তিবাসীদের স্বীকারোক্তিমূলক কবিতাশাসিত পরিসরে দেবারতি মিত্র-র আবির্ভাব। যৌনতার নারীকেন্দ্রিক বয়ান নির্মাণে এই মগ্ন ও অন্যথায় লিঙ্গ-নির্বিশেষ ও প্রশমিত শব্দব্যবহারের কবি অদ্ভুত এক স্বতঃস্ফূর্ততা রেখেছিলেন। যাকে অশ্লীল বলা চলেই না। চিত্রকল্পের আশ্চর্‌য কৃতিতে তাঁর রচনায় রতিক্রিয়া একটি দিব্যবিভা প্রাপ্ত হয়। ‘প্রিয়তম পুরুষটি এক পা একটুখানি উঁচু করে’ …দিয়ে শুরু হয় কবিতা, এবং কিছু পরে ’ সুকুমার ডৌলভরা মাংসল ব্রন্‌জের উরু’ ‘ হঠাৎ সচল হয়ে ডাকে তরুণীকে’ – এই বর্ণনা আমাদের স্তম্ভিত করে , এবং মনে হয় পৃথিবী যেন পুনরাবিষ্কৃত হল। এর পরেও আর কোন লেখায় সম্ভব হল না এমন বর্ণনা : যেখানে মেয়েটি–  “অসম্ভব অনুরক্তা শিশুসুলভতা নিয়ে/ অচেনা আশ্চর্‌য এক লালচে কিসমিসরঙা/ ফুলের কোরক মুখে টপ করে পোরে, / মাতৃদুধের মত স্বাদু রস টানে/ ক্রমে তার মুখে আসে/ ঈষদচ্ছ অনতিশীতোষ্ণ গলা মোম/ টুপটাপ মুখের গহবরে ঝরে পড়ে/ পেলিকান পাখিদের সদ্যোজাত ডিম ভেঙে জমাট কুসুম নয়/ একটু আঁষটে নোনতা স্বচ্ছ সাদা জেলি “ (পৃথিবীর সৌন্দর্য একাকী তারা দুজন)

এই চিত্ররূপময় বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্ব সাহিত্যেই দুর্লভ বলে মনে হয়। অথবা যদি দেখি আর একটি কবিতাতে :
আমার দারুণ লোভ হয়েছে/ তুমি আমার খুব ভিতরে চলে আসো/ নিবিড় গোপন ভ্রূণ আমার জরায়ুতে বাড়ো/ আমি তোমায় লালন করি/… আমার প্রতি রোমকূপের স্নেহ তোমায় ভিজিয়ে রাখুক। (স্তব, আদর, পাগলামি কিংবা যাহোক কিছু)

এমন তন্নিষ্ঠ ডিটেলিং কবিতাকে ব্যক্তির স্তর থেকে শিল্পের স্তরে নিয়ে গেছে। আর, আমার মতে, এর ফলেই বাংলা কবিতায় নারীকেন্দ্রিক যৌন কবিতার একটি স্পষ্ট পরিসর তৈরি হয়। এ নিয়ে কথা বলার পরিসর তৈরি হয়। আমাদের কাছে একটি বিষয় আসে। মেল গেজ ফিমেল গেজ-এর ধারণাকে তখন কেবল বিদেশ থেকে ধার করে আনা একটি থিম বা বিষয় , বা আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়ার উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ব্যাপার বলে কোন কুযুক্তি মাথা তুলতে পারে না।

মেয়েদের কবিতায় নারীত্ব খুঁজে তাকে লেবেল পরানো অভিপ্রেত ছিল না দেবারতি মিত্র-র। নিজেকে কখনো এই আইডেন্টিটি বা সত্ত্বায় উচ্চকিতভাবে চিহ্নিত করতেও চাননি। নিজের কবিসত্ত্বাকে নির্লিঙ্গ বলেই ভাবতে চেয়েছিলেন তিনি।

আরোপিত নারীত্ব খুঁজে, যৌনতার উচ্চকিত স্বর খুঁজে তাঁকে নারীবাদী হিসেবে চালানোর কোন বাসনাই নেই আমা্র। এভাবে সীমিত করে দেওয়া অভিপ্রেতও নয়।

যশোধরা রায়চৌধুরী : মেয়েদের আলাদা বলে আমি মানি না/ মেয়েদের ওসব হাবিজাবিতেই যদি বিশ্বাস করব/তবে তো কূর্ম পুরাণ আর বারবারা গেস্টের/ ননসেন্স পড়ে পড়ে হারিপারি হয়ে যাব। / আমি নেউলজাতির দেশদ্রোহে বিশ্বাস করি/ কিন্তু কোন তত্ত্বকথায় নয়। ( অচিনের বৃত্তান্ত)

এটা আপনার লেখা। নিজেকে মেয়ে লেখক বা মেয়ে কবি হিসেবে চিহ্নিত করা কি আপনার অনভিপ্রেত? কীভাবে দেখতে চান নিজেকে, তবে?

দেবারতি মিত্রঃ তুমি ঠিকই বুঝেছ, মেয়ে লেখক হিসেবে আমি নিজেকে আলাদা করে ভাবি না । আমি নারীত্বের পক্ষে, কিন্তু মেয়েলিপনার বিপক্ষে।

যশোধরা রায়চৌধুরী :এর পাশাপাশিই, যখন লেখেন আপনি, “এই সেই পুরনো বাড়ি, ভাঙা জানলা/ মাকড়শার জাল ফলে আছে মাধবীলতার মতো/ এই ঘরে হাওয়া দেয়, আলোছায়া বেড়াতেও আসে/ … বাইরে শিরীষ গাছ,/ বাড়িঘর তৈরির মশলা মেশাবার পুরুষ মেশিন – / ঝড়ঝড় চড়চড় কড়া শব্দ। “ ( এখানে হয়তো )

নির্ভুলভাবে আপনাকে চিনে নিতে পারি এক ইকোফেমিনিস্ট হিসেবে। প্রকৃতিনারীবাদের কবিতা তো এইই। এ ছাড়া আর কীই বা। আমার এই ব্র্যান্ডিং বা লেবেলিং কে মেনে নেবেন আপনি?

দেবারতি মিত্রঃ কোনওরকম নির্দিষ্ট মতবাদের আওতার ভেতর আমি যেতে চাই না। আমার মনে হয় এ কবিতাটা বোধ হয় মায়ামমতার কবিতা।

যশোধরা রায়চৌধুরী : এ কথা তো ঐতিহাসিকভাবে অনস্বীকার্য যে কবিতা সিংহ, রাজলক্ষ্মী দেবীর মতই, দেবারতি মিত্র-র অন্তত কয়েকটি কবিতাকে স্থান দিতেই হয়, নারীযৌনতার কবিতার ধারাভাষ্য রচনা করতে গেলে। যৌনতার সৌন্দর্য আপনি যে দক্ষতায় বা অবলীলতায় লেখেন তা কোনো পুরুষ কবির পক্ষেও প্রায় অসাধ্য, এবং এই সৌন্দর্যনির্মিতির জন্যই মাইকেলেঞ্জেলো বা বের্নিনিদের কাছাকাছি শিল্পবস্তুটি হাশিল করে ফেলেছেন আপনি। ‘আমার পুতুল’ এর কবিতা দু তিনটি। ‘ স্তব , আদর, পাগলামি কিংবা যাহোক কিছু”, অথবা , ‘পৃথিবীর সৌন্দর্য একাকী তারা দুজন’ অথবা ‘পদ্মগোখরোর শিস’। এই বিষয়ে বলুন। এসব লেখা লেখার কথা ভাবলেন কেন, এবং কীভাবে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে। যখন বিন্দুমাত্র যৌনতাও কলমে আনা মেয়েদের পক্ষে এক ট্যাবু। অথচ আপনি উচ্চকিত প্রতিবাদী নারীবাদী তো নন।

দেবারতি মিত্রঃ  সামাজিকতা ও অবদমনের সংস্কার ভেঙেচুরে নতুন কিছু লিখব বলে ওই কবিতাগুলো আমি লিখিনি। ভেবেচিন্তেও কিছু করিনি। কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না, যৌবনের প্রবল উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বাঁধভাঙ্গা প্রেম ভালোবাসার সংমিশ্রনে এদের জন্ম।
আর একটা কথা, এ কবিতাগুলির কবিত্বগুণ নেহাতই মাঝারি। এরা ‘ভূতেরা ও খুকি’ বা ‘আমার মেয়েরা’ নয়। আর, যশোধরা, এই যে বললে “পুরুষ কবির পক্ষেও অসাধ্য”, এর মানে কী? তোমার মত স্বাধীনচেতা একজন মহিলা, একজন বুদ্ধিদীপ্ত কবি কি সতযি সত্যি বিশ্বাস করে পুরুষরা মেয়েদের চেয়ে উৎকৃষ্ট? এক গায়ের জোর ছাড়া, অন্যান্য অনেক বিষয়ে দুর্বল ভেবে, আমি তো বরাবর ওদের একটু স্নেহ আর প্রশ্রয়ের চক্ষে দেখে থাকি।

যশোধরা রায়চৌধুরী : না আমার কথার এটাই অর্থ ছিল যে, লিখিত অক্ষরে যৌনবিষয় লেখার একটা ঘরানা বা ঐতিহ্য পঞ্চাশের কবিতায় ছিল, তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ বলে, যেন সামাজিক একটা স্বীকৃতি আছেই যে পুরুষরা এই বিষয় ভাল লিখবেন। তাই তুলনাটা এসেই পড়ে।

(সাক্ষাৎকারের অংশ , ২০১৬)

তথাপি, নারীবাদী হিসেবে, অনুজ হিসেবেই না দেখে পারি না, একটার পর একটা কবিতায় তিনি রেখে যাচ্ছেন কিছু অব্যর্থ চিহ্নই, আসলে। যখন লিখছেন, কলঘরের মেঝেতে বসার কথা, অথবা “ছেঁড়া যেখানটা ছেঁড়াই থাক/ রিফুর কাজে নক্ষত্রের ছুঁচ, নদীপ্রবাহের সুতো/ ব্যবহার করে কী লাভ?” তখনো তো বিশেষভাবে এক নারীবিশ্বের কথাই উঠে আসে। লিখছেন, ‘যখন হয় না, তখন একটা তারা একটা নক্ষত্রকে/ গায়ের জোরে ধাক্কা দিলেও কিছু হয় না। …আবার যখন হয় তখন একটু মৌরি সুপুরিকুচিতেও হয়।‘ ( অথচ কখনো) এ কথা একজন মহিলা হিসেবেই তিনি লিখতে পারলেন, মনে হয় আমার।

Facebook Comments

Related posts

One Thought to “দেবারতির কবিতাবিশ্ব”

  1. barnali koley

    খুব ভালো লাগল।সমৃদ্ধ হলাম।

Leave a Comment